ন্যায়বিচার

ইসলাম এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা- এ দুটো ব্যাপারের মধ্যে সম্পর্ক খুব গভীর। কেউ যদি কুর’আন খুলে দেখে তাহলে সে দেখতে পাবে ইসলাম ন্যায়ের কথা বলে। কেউ যদি ইসলামের ইতিহাস পড়ে দেখে তাহলে সে দেখতে পাবে ইসলাম কেবল ন্যায়ের কথা বলে তা না, সে ন্যায় প্রতিষ্ঠাও করেছে। ইসলামের প্রথম যুগে একটি ফিতনা হয়েছিল, আলী (রাঃ) এবং মু’আবিয়া (রাঃ) এর মধ্যকার যুদ্ধ, সে যুদ্ধটিও হয়েছিল ন্যায়ের জন্য ! আমি যখন প্রথম প্রথম ইসলাম শিখি একটা আয়াত পড়ে খুব অভিভূত হয়েছিলাম। আয়াতটি কুর’আনের সূরা নিসা,

হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত। [সূরা নিসাঃ১৩৫]

এই একটি আয়াত, এই একটিই আয়াতই একজন মানুষের worldview তে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিতে পারে ! জাহেলিয়াতের যুগে আরবের লোকেরা নিজেদের গোত্র আর পরিবারেকে সবকিছু মনে করতো, তাদের সম্মানের জন্য একজন মানুষ জান দিয়ে দেবে টাইপের অবস্থা ! কিন্তু ইসলাম আসলো, আল্লাহ শিখিয়ে দিলেন, না, গোত্র,জাতীয়তা বা পরিবার আগে, নয় তোমার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু বান্ধব, কিংবা তোমার স্বার্থ নয়, সবার আগে যে জিনিষটাকে প্রাধান্য দিতে হবে তা হচ্ছে ন্যায় বা justice। যে জিনিষ অর্জনের জন্য তুমি জান দিয়ে দেবে তা হচ্ছে এই ন্যায়।

রবিয়া ইবনে আমর (রাঃ) এই ব্যাপারটি আরো বড় এঙ্গেল থেকে বুঝতে পেরেছিলেন, তাই রোমান সেনাপতি যখন তাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমরা আমাদের সাথে কেন যুদ্ধ করতে এসেছ?”, উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা নিজে থেকে তোমাদের কাছে আসি নি, আমাদেরকে আল্লাহ তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, যেন তার ইচ্ছায় আমরা তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, মানুষের দাসত্ব এবং তোমাদের ধর্মের জুলুম থেকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আনতে পারি”।

রবিয়া ইবনে আমর (রাঃ) জাকির নায়েকের মত comparative religion নিয়ে extensive কোন পড়াশোনা করেননি, তার কোন PhD ডিগ্রী ছিল না, কিন্তু তিনি জানতেন ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্ম এবং মানবরচিত তন্ত্র-মন্ত্র বা আদর্শ কিংবা দর্শন যা-ই বলি, সেগুলো সবগুলো জুলুম, আর সত্যিকার ন্যায়বিচার একমাত্র ইসলামেই আছে। ইসলাম পরকালমুখী একটা জীবনব্যবস্থা, কিন্তু এর মানে এই নয় যে দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলামের কোন say নেই, বরং আল্লাহ ইসলাম দিয়েছেন এই দুনিয়ার জীবন ইসলাম মোতাবেক পরিচালনার জন্য যার পূর্ণ ফলাফল হবে আখিরাতে।

আমরা যদি সূরা নিসার ১৩৫ নাম্বার আয়াতে আবার ফিরে যাই তাহলে আমরা দেখব, আল্লাহ বলছেন ন্যায়-সাক্ষ্য দিতে, ন্যায়সঙ্গত বিচার করতে। গত কয়েকদিন ধরে, শাহবাগে তথাকথিত “গণজাগরণে” অনেকে সমবেত হয়েছে “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার” এর আশায়। ইসলাম যে কোনো অপরাধ, হোক সেটা খুব তুচ্ছ, সেটাও বিচার করতে বলে, কিন্তু জাহেলিয়াত এর সাথে ইসলামের পার্থক্য হচ্ছে, যেকোন প্রকারে, যেন-তেন ভাবে একটা বিচার করে রায় দিয়ে নিজের খায়েশ-ক্ষোভ এগুলো মিটিয়ে ফেলাটা বিচার করার উদ্দেশ্য না, বরং, ন্যায়ের সাথে সত্যের সাথে যেকোনো অপরাধের বিচার করা যেন শাস্তির মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং দুনিয়ার বুকে একই অপরাধ অন্য কোন অপরাধী করতে সাহস না পায়।

যেকোনো বিচার আল্লাহর চোখে গ্রহণযোগ্য হবার শর্ত সেটা ন্যায়বিচার হতে হবে, সেখানে স্বজনপ্রীতি থাকা চলবে না, নিজের স্বার্থ হাসিল করা চলবে না। আজকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে আওয়ামী-লীগ, যে দলের ৯ বছরের শাসনে “ন্যায়ের শাসন” থাকা দূরে থাক, আছে দূর্নীতি, অপরাধ, দালালি আর অন্যায়ের বস্তা-বস্তা রেকর্ড। আপনি এদের কাছ থেকে “ন্যায়-বিচার” আশা করতে পারেন, আমি করি না। আমি “ন্যায়-বিচার” শিখতে চাই না সেসব বামদলদের, যাদের মনে আছে ইসলাম বিদ্বেষ, যারা গাঞ্জা খেয়ে চারুকলায় মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, যারা মুখে নাস্তিকতা আর নববর্ষের নতুন সূর্যের উপাসনা করে, যারা বিশ্বাস করে ধর্ম হচ্ছে আফিমের মত, যারা মনে করে ধর্মের কোন স্থান একুশ শতকে নেই। আপনি তাদের কাছ থেকে “ন্যায়-বিচার” আশা করতে পারেন, আমি করি না, আমি দুঃখিত।

আমি শিখেছি, একমাত্র ইসলামই হচ্ছে ন্যায়ের ধর্ম, গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে জুলুম, আর যারা এসব তত্ত্বে বিশ্বাসী তারা করবে ন্যায়-বিচার, আমি বিশ্বাস করতে পারি না। আপনারা খুব ভাল করে জানেনা আওয়ামী সরকার কতটা “ন্যায়পরায়ণ”, আপনি খুব ভাল করে জানেন তাদের কাছে এই দেশের মানুষ বড় নাকি নিজের পকেট বড়, তা জেনেও আপনি আশা করতে পারেন তারা যথার্থ বিচার করবে, আমি করি না, কারণ আমি জানি যারা মনে করে আল্লাহর দ্বীনকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্রকে সঠিক মনে করে, ধর্মনিরপেক্ষতাকে যুগোপযোগী মনে করে, এ দুনিয়ার ক্ষমতা তাদের কাছে মুখ্য, আমি তাদের কাছে কিছু আশা করি না। ফির’আউন ও বলতো, “আমি তো তোমাদের ভালই চাই”।

আমি একাত্মতা ঘোষণা করতে চাই না সেসব কমিউনিস্টদের সাথে, যারা কার্ল মার্ক্সের থিওরি কপচায়, যারা মনে করে মানুষ একটা উন্নত পশু, যারা মনে করে ধর্ষণ হোক কিংবা সমকামিতা- সবই ন্যাচারাল ব্যাপার। আমি তাদের কাছে শিখব ন্যায়ের সংজ্ঞা ? যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ বলেছেন সারা পৃথিবীর জন্য “রাহমা” স্বরুপ, তাকে যারা অস্বীকার করে, তাকে যারা ব্যাঙ্গ করে, তাদের সাথে আমি এক মিছিলে স্লোগান দেব? তাও আবার ন্যায়ের আশায় ? আমি কি দেখি নি সোভিয়েত ইউনিয়নে তারা কোন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তারা করবে ন্যায়বিচার ? যে জাফর ইকবাল তার “নতুন পৃথিবী” তে কোন দেশ থাকবে না বলে স্বপ্ন দেখে, সে-ই যে কোন দেশ-অপরাধীর বিচার চায় আমি কি বুঝি না ?

আপনি হয়তো বলতে পারেন, এই সরকার যদি এদের বিচার না করে, তাহলে আর কোনদিন এদের বিচার করা সম্ভব হবে না, কথাটা মিথ্যা। হ্যা, এই দুনিয়ায় বিচার হবে না সত্য, আমেরিকাকে জামাতের পক্ষ নেবে, ভারত আওয়ামী লীগের ! কিন্তু এই যুদ্ধাপরাধীগুলো কি পারবে আল্লাহর হাত থেকে পালিয়ে বাচঁতে? আমি মুসলিম, আমি গায়েবে বিশ্বাস করি, আমি জানি ক্বিয়ামাহ এর দিন আল্লাহ সব কয়টা মুজরিমীন(criminal)দের জড়ো করবেন। আল্লাহ কুর’আনে অসংখ্যবার মুজরিমীনদের সেই ভয় দেখিয়েছেন। আমরা কাছে তাই যে-কোন-রকমে বিচার করাটাও মুখ্য না, মুখ্য হচ্ছে ন্যায়-বিচার। আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, কিন্তু সে জন্য আমি শাহবাগে যাব না, আমি জালিম সরকারের কাছে ধর্ণা দেব না, আপাতত আমি আল্লাহর কাছে দু’আ করবো যেন তিনি এই দুনিয়ার বুকেই এসবের ফয়সালা করেন কোন এক ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকের হাতে।

Collected From

https://www.facebook.com/notes/collected-notes-and-discussion/আমি-শাহবাগ-যেতে-চাই-না-/609463739069544

Advertisements